
দক্ষিণ দিনাজপুরের রাজগঞ্জে স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এই মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে উঠে আসা রাজগঞ্জের বিডিও প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার আবেদন করেছে বিধাননগর পুলিশ। কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, অভিযুক্ত বিডিওকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও তিনি আদালতে হাজির না হওয়ায় পুলিশ বাধ্য হয়ে ফের আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।
আদালতে বিধাননগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযুক্ত প্রশান্ত বর্মন আত্মসমর্পণ না করায় মামলার তদন্তে গুরুতর প্রভাব পড়ছে। তদন্তের স্বার্থেই তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা প্রয়োজন বলে আদালতকে অবহিত করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, অভিযুক্তকে আইনের আওতায় না আনতে পারলে প্রকৃত সত্য উদঘাটনে বাধা সৃষ্টি হবে।
এই ঘটনার পর থেকেই রাজগঞ্জ সহ আশপাশের এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছে। স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের মতো গুরুতর অপরাধে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক আধিকারিকের নাম জড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা এবং অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, প্রশাসনের এক শীর্ষ পদে থাকা আধিকারিক কীভাবে এমন একটি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।
এদিকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদনের খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজগঞ্জের বিডিও প্রশান্ত বর্মন কার্যত উধাও হয়ে গেছেন বলে অভিযোগ। তার কোনও হদিশ মিলছে না। অফিস, সরকারি বাসভবন কিংবা পরিচিত মহল কোথাও তার দেখা মেলেনি। এলাকাবাসীর দাবি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তিনি আত্মগোপন করেছেন।
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার সাঁটিয়ে নিখোঁজ বিডিওর সন্ধান চাওয়া হচ্ছে। কোথাও লেখা “বিডিও কোথায়?”, আবার কোথাও “আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।” সাধারণ মানুষের বক্তব্য, একজন সরকারি আধিকারিক যদি আইন এড়িয়ে পালিয়ে বেড়ান, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় থাকবে?
এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রশান্ত বর্মনের সঙ্গে বর্তমানে কে কে রয়েছেন বা তিনি কোথায় আত্মগোপন করে আছেন, সে বিষয়ে কেউ কিছুই জানেন না। পুলিশও তার খোঁজে হন্যে হয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন সম্ভাব্য ঠিকানায় অভিযান চালানো হলেও এখনও পর্যন্ত কোনও সাফল্য মেলেনি।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত বিডিও প্রশান্ত বর্মনের সরাসরি কোনও প্রতিক্রিয়া এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে তার ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি দাবি করেছেন, এই ঘটনার সঙ্গে তিনি কোনওভাবেই প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁকে এই মামলায় জড়ানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেছেন, প্রশাসনিক কাজে তার কঠোর অবস্থান এবং কিছু প্রভাবশালী মহলের স্বার্থে আঘাত লাগায় তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তাঁর জনপ্রিয়তা এবং কাজের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়েই এই প্রতিহিংসামূলক চক্রান্ত চলছে বলে তিনি মনে করছেন।
এই আবহে জানা গেছে, প্রশান্ত বর্মন ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাঁর আবেদন গ্রহণ করা হবে নাকি খারিজ হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। বিষয়টি আপাতত বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। আইনি মহলের একাংশের মতে, যদি সুপ্রিম কোর্ট থেকে কোনও অন্তর্বর্তী স্বস্তি না মেলে, তাহলে অভিযুক্ত বিডিওর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে রাজগঞ্জ জুড়ে প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, তিনি কীভাবে কাজ করতেন, তার প্রশাসনিক ভূমিকা কেমন ছিল সবই তাঁদের জানা। কেউ কেউ আবার বলছেন, পুরো ঘটনা অত্যন্ত ধোঁয়াশাপূর্ণ এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
বিক্ষোভ, পোস্টার, আলোচনা সব মিলিয়ে রাজগঞ্জ এখন কার্যত উত্তাল। বাজার, চা দোকান, পাড়া-মহল্লা সর্বত্র একটাই আলোচনা বিডিও কোথায়, তিনি কি আত্মসমর্পণ করবেন, না কি আরও বড় কোনও আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটবেন? প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। সাধারণ মানুষের একাংশের দাবি, অভিযুক্ত যেই হোন না কেন, আইন অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ করা উচিত।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদনের পর থেকেই গোটা রাজগঞ্জ এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া কোন দিকে মোড় নেয়, অভিযুক্ত বিডিও আত্মসমর্পণ করেন কি না, কিংবা আদালত ও উচ্চতর আদালতের রায় কী হয়—সেই দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজগঞ্জ সহ রাজ্যের মানুষ। এই মামলার পরিণতি শুধু একটি খুনের ঘটনার বিচারই নয়, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রেও এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে চলেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।














