
ত্রিপুরা রাজ্যের শিক্ষা জগতে এক অনন্য ও গৌরবময় ইতিহাস রচনা করলেন সুচনা নাথ। পরপর দুইটি পেশাগত ডিগ্রিতে স্বর্ণপদক অর্জনের মাধ্যমে তিনি শুধু রাজবাড়ি, ধর্মনগর বা উত্তর ত্রিপুরাই নয়, সমগ্র ত্রিপুরা রাজ্যকে গর্বিত করেছেন। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও অদম্য মানসিক শক্তির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সুচনা নাথ আজ রাজ্যের শিক্ষার্থীদের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর-এর অধীনে ২০২৩–২০২৫ শিক্ষাবর্ষে Department of Education-এর এম.এড. চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান (First Rank Holder) অর্জন করেন সুচনা নাথ। এই অসামান্য কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩তম সমাবর্তনে তাঁকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করা হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে এই সাফল্য তাঁকে রাজ্য ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এর আগেও তাঁর ঝুলিতে ছিল উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ২০২৪ সালে Vivekananda College of Education থেকে বি.এড. পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য তিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচরের ২১তম সমাবর্তনে স্বর্ণপদক লাভ করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা মোট ১৩টি কলেজের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে তিনি এই সম্মান পান। পরপর বি.এড. এবং এম.এড. – দুইটি পেশাগত ডিগ্রিতে স্বর্ণপদক অর্জন সত্যিই বিরল ও ব্যতিক্রমী সাফল্য, যা শিক্ষামহলে বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়েছে।

বর্তমানে সুচনা নাথ শ্রীভূমির বিবেকানন্দ কলেজ অব এডুকেশন-এ নিয়মিত প্রভাষক (লাইফ সায়েন্স মেথড) হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি ১৭ জুলাই ২০২৫ তারিখে এম.এড. চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন করার পর কলেজ কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তাঁর এই নিয়োগ একদিকে যেমন তাঁর একাডেমিক যোগ্যতার স্বীকৃতি, তেমনই শিক্ষকতা পেশায় তাঁর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করে।
নিজের এই সাফল্যের জন্য সুচনা নাথ গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর-এর মাননীয় চ্যান্সেলর, ভাইস-চ্যান্সেলর, ডিন, সম্মানিতা বিভাগীয় প্রধান এবং Department of Education-এর সকল অধ্যাপক ও অশিক্ষক কর্মীদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তাঁদের নিরবচ্ছিন্ন দিকনির্দেশনা, উৎসাহ ও সহযোগিতাই তাঁর সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি বলে তিনি জানান। পাশাপাশি শ্রীভূমির বিবেকানন্দ কলেজ অব এডুকেশন-এর গভর্নিং বডি, সভাপতি, VCED সোসাইটির সদস্যবৃন্দ, অধ্যক্ষা, প্রভাষক ও অশিক্ষক কর্মীদের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

সুচনা নাথের শিক্ষাজীবন শুরু থেকেই সাফল্যে ভরপুর। ২০১৯ সালে তিনি ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সরকারি ডিগ্রি কলেজ, ধর্মনগর থেকে বি.এসসি. (জুলজি অনার্স) পরীক্ষায় র্যাঙ্ক হোল্ডার হিসেবে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে ২০২১ সালে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর থেকে এম.এসসি. মাইক্রোবায়োলজি ডিগ্রি অর্জন করেন। শুধু পড়াশোনাতেই নয়, সহ-পাঠক্রমিক ক্ষেত্রেও তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০২৩ সালে সমগ্র আসাম রাজ্যব্যাপী কুইজ প্রতিযোগিতায় তিনি রৌপ্য মুদ্রা লাভ করেন এবং একই বছরে Magic Book of Record থেকে “BEST ACHIEVER’S Award 2023 – Multi Talented Award” সম্মানে ভূষিত হন।
একটি সাধারণ শিক্ষানুরাগী পরিবার থেকেই সুচনা নাথের বেড়ে ওঠা। তাঁর পিতা শ্রী সামারজিৎ নাথ উত্তর ত্রিপুরার ধর্মনগরের বাগবাসা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, মাতা শ্রীমতি বাবলি নাথ একজন গৃহিণী এবং ছোট বোন মানবিনা নাথ বর্তমানে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর থেকে পদার্থবিজ্ঞানে এম.এসসি. অধ্যয়নরত। সুচনা নিজেই স্বীকার করেছেন, তাঁর এই সাফল্যের নেপথ্যে পরিবারের, বিশেষ করে পিতার অবদান অপরিসীম।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২০ সাল থেকে তাঁর মাতা গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছেন এবং এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ নন। এমন কঠিন পারিবারিক পরিস্থিতির মধ্যেই সুচনা নাথ বি.এড. ও এম.এড. চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। মানসিক চাপ, দায়িত্ব ও প্রতিকূলতার মধ্যেও অদম্য অধ্যবসায় ও দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে তিনি সাফল্যের শিখরে পৌঁছান।
এই অসামান্য কৃতিত্বে আজ ত্রিপুরার ছাত্রসমাজসহ রাজ্যের সর্বস্তরের মানুষ গর্বিত। সুচনা নাথ বর্তমানে নিষ্ঠা, সংগ্রাম ও একাডেমিক উৎকর্ষের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যিনি আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।
















